শুভঙ্কর পালের ডায়রি
Friday, July 31, 2020
Wednesday, July 22, 2020
অনুগল্প
সান্টাক্লস
শুভঙ্কর পাল
নীল আকাশের দিকে চেয়ে থাকা চিমনীগুলো দিয়ে ধুঁয়া উড়ছে । বাঁকা সর্পিল ধুঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যেই মিশে থাকে বুধু ও মুনিয়াদের জীবন । ওদের জীবনের রথের চাকাও সেই মহাভারতের যুগ থেকেই কিংবা তারো আগে থেকেই যেনো গেঁথে আছে মাটির সাথে । হাজার চেষ্টা করেও টেনে তুলতে পারছে না । আচ্ছা , পারবে কী করে বলুন , যে কটা টাকা মজুরি পায় তাতে সবার পাতে ডাল ভাত যোগার করতেই শেষ । একটু ভালো পোশাক , একটু ভালো শিক্ষা সেসব এরা এখনও ঠিক ভাবে কল্পনাও করতে পারে না । তবে ওই বাগানের পরেই শুরু হয়ে যাওয়া ওই বিরাট বিরাট পাহাড়ের মতোই ওদের মন । একবার পুখুরিয়া গ্রামে গিয়েছিলাম ডিসেম্বরের রাতে । সুব্রত , গোপেশ , সুকান্ত দা সবাই ছিলো । রাতের চাঁদের আলোয় সেই ডিসেম্বরের রাতে মেঠো পথ যেনো হাড়িয়ার নেশায় দুলে দুলে উঠছিল । বুধুর বাড়িয়ে দেয়া পেয়ালা ফেরাতে পারিনি । ওই প্রথম আঁচের আগুনে লোহার শিকে শূকরের মাংস পুড়িয়ে খেয়েছি । আর সাদা দুধের রঙের হাড়িয়া একটু তীব্র ঝাঁজ গন্ধ নিয়ে উল্টি হবার জোগাড় । না তেমন কিছু হয়নি , একটু বাদে সব সয়ে গেছে । আসলে এই আতিথেয়তায় ভুলেই গেছি রাত কখন দুটো বেজে গেছে । বড়দিনের রাতে ওই বাঁশিওয়ালা যখন সুর ধরে পায়ে তখন তাল ওঠে আর মাদল , ধামসার তালে তালে মেয়েরা উঠোনে জ্বালানো আগুন ঘিরে নাচতে থাকে । নাকে নাকছাবির উপর চাঁদের আলো এসে পড়লে চিক চিক করে ওঠে রূপোলি রঙ । পায়ে পায়ে রাঙতা মোড়া চুড়ি আর হাতের কাঁকনজুড়ে রঙবাহারি ফুলের মালা জড়ানো । মুনিয়ার মাথার খোঁপায় রঙ বেরঙের পাতা গোঁজা । নিজেরাই কোমরে কোমরে হাত রেখে এক বিশেষ নৃত্যভঙ্গি নিয়ে তালে তালে গেয়ে ও নেচে যাচ্ছে । বিপরীতে ওদের মরদেরাও হাতে হাত রেখে , কেউ বা মাদল , কেউ আবার ধামসা নিয়ে নেচে যাচ্ছে । কখন যে ওদের হাত ধরেছি মনেই নেই । নাচের তালে তালে আর সেই হাড়িয়ার গন্ধে আমরা যেনো এক ভিন দেশি যাত্রী সবাই । মেঘবিহীন আকাশ আলো করে একটু একটু করে চাঁদ ও তারারা সরে যাচ্ছে । না , সেদিন রাতে আর ভাত খাওয়া হয়নি । সন্ধ্যের খিচুড়ি ততক্ষনে মিয়ে পড়েছে । বাঁশের ডাল থেকে রাত পেঁচা সেও বোধহয় আমাদের উল্লাস উপভোগ করছিলো , চোখ পড়তেই লজ্জায় উড়ে গেলো ওই দূরের গাছটায় । আগুন ঝিমিয়ে আসে , ভোরের আলো ফুটতে এখনও ঘণ্টা আড়াই বাকি । যে যার মতো সবাই যেনো একটু নেশায় বুঁদ । মুনিয়াদের বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ । বিদায় নেবার আগে জানতে পারলাম ওই বড়োদিনের দিনেও চা বাগানে কাজ নেই বলে ওদের ঠিকমতো খাবার জোটেনি । ওই চার্চের কেকটুকু খেয়ে এসেই ঘুমিয়ে পড়েছে । না , চোখে আর জল ধরে রাখতে পারলাম না । মুনিয়াদের ওই ঘুমন্ত ছেলেমেয়েগুলোর দিকে এগিয়ে গিয়ে ওদের কপালে হাত বুলিয়ে দিই । আর পকেট থেকে দুশো টাকা বের করে বুধুর হাতে গুঁজে দিয়ে বলি , এই টাকাটা দিয়ে কাল ওদের জন্য ভালো কিছু এনে রেঁধে খাইয়ো । এই বেকার সান্টাক্লসের এর বেশি যে দেবার মুরোদ নেই । বুধু ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে আর ঈশ্বরের কাছে বলে ওঠে প্রভু এইভাবেই তুমি আমার কাছে সান্টাক্লস হয়ে এলে , হ্যাঁ আকাশে নয় এই পৃথিবীতেই তুমি আছো ।
শুভঙ্কর পাল
নীল আকাশের দিকে চেয়ে থাকা চিমনীগুলো দিয়ে ধুঁয়া উড়ছে । বাঁকা সর্পিল ধুঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যেই মিশে থাকে বুধু ও মুনিয়াদের জীবন । ওদের জীবনের রথের চাকাও সেই মহাভারতের যুগ থেকেই কিংবা তারো আগে থেকেই যেনো গেঁথে আছে মাটির সাথে । হাজার চেষ্টা করেও টেনে তুলতে পারছে না । আচ্ছা , পারবে কী করে বলুন , যে কটা টাকা মজুরি পায় তাতে সবার পাতে ডাল ভাত যোগার করতেই শেষ । একটু ভালো পোশাক , একটু ভালো শিক্ষা সেসব এরা এখনও ঠিক ভাবে কল্পনাও করতে পারে না । তবে ওই বাগানের পরেই শুরু হয়ে যাওয়া ওই বিরাট বিরাট পাহাড়ের মতোই ওদের মন । একবার পুখুরিয়া গ্রামে গিয়েছিলাম ডিসেম্বরের রাতে । সুব্রত , গোপেশ , সুকান্ত দা সবাই ছিলো । রাতের চাঁদের আলোয় সেই ডিসেম্বরের রাতে মেঠো পথ যেনো হাড়িয়ার নেশায় দুলে দুলে উঠছিল । বুধুর বাড়িয়ে দেয়া পেয়ালা ফেরাতে পারিনি । ওই প্রথম আঁচের আগুনে লোহার শিকে শূকরের মাংস পুড়িয়ে খেয়েছি । আর সাদা দুধের রঙের হাড়িয়া একটু তীব্র ঝাঁজ গন্ধ নিয়ে উল্টি হবার জোগাড় । না তেমন কিছু হয়নি , একটু বাদে সব সয়ে গেছে । আসলে এই আতিথেয়তায় ভুলেই গেছি রাত কখন দুটো বেজে গেছে । বড়দিনের রাতে ওই বাঁশিওয়ালা যখন সুর ধরে পায়ে তখন তাল ওঠে আর মাদল , ধামসার তালে তালে মেয়েরা উঠোনে জ্বালানো আগুন ঘিরে নাচতে থাকে । নাকে নাকছাবির উপর চাঁদের আলো এসে পড়লে চিক চিক করে ওঠে রূপোলি রঙ । পায়ে পায়ে রাঙতা মোড়া চুড়ি আর হাতের কাঁকনজুড়ে রঙবাহারি ফুলের মালা জড়ানো । মুনিয়ার মাথার খোঁপায় রঙ বেরঙের পাতা গোঁজা । নিজেরাই কোমরে কোমরে হাত রেখে এক বিশেষ নৃত্যভঙ্গি নিয়ে তালে তালে গেয়ে ও নেচে যাচ্ছে । বিপরীতে ওদের মরদেরাও হাতে হাত রেখে , কেউ বা মাদল , কেউ আবার ধামসা নিয়ে নেচে যাচ্ছে । কখন যে ওদের হাত ধরেছি মনেই নেই । নাচের তালে তালে আর সেই হাড়িয়ার গন্ধে আমরা যেনো এক ভিন দেশি যাত্রী সবাই । মেঘবিহীন আকাশ আলো করে একটু একটু করে চাঁদ ও তারারা সরে যাচ্ছে । না , সেদিন রাতে আর ভাত খাওয়া হয়নি । সন্ধ্যের খিচুড়ি ততক্ষনে মিয়ে পড়েছে । বাঁশের ডাল থেকে রাত পেঁচা সেও বোধহয় আমাদের উল্লাস উপভোগ করছিলো , চোখ পড়তেই লজ্জায় উড়ে গেলো ওই দূরের গাছটায় । আগুন ঝিমিয়ে আসে , ভোরের আলো ফুটতে এখনও ঘণ্টা আড়াই বাকি । যে যার মতো সবাই যেনো একটু নেশায় বুঁদ । মুনিয়াদের বাচ্চারা ঘুমিয়ে পড়েছে অনেকক্ষণ । বিদায় নেবার আগে জানতে পারলাম ওই বড়োদিনের দিনেও চা বাগানে কাজ নেই বলে ওদের ঠিকমতো খাবার জোটেনি । ওই চার্চের কেকটুকু খেয়ে এসেই ঘুমিয়ে পড়েছে । না , চোখে আর জল ধরে রাখতে পারলাম না । মুনিয়াদের ওই ঘুমন্ত ছেলেমেয়েগুলোর দিকে এগিয়ে গিয়ে ওদের কপালে হাত বুলিয়ে দিই । আর পকেট থেকে দুশো টাকা বের করে বুধুর হাতে গুঁজে দিয়ে বলি , এই টাকাটা দিয়ে কাল ওদের জন্য ভালো কিছু এনে রেঁধে খাইয়ো । এই বেকার সান্টাক্লসের এর বেশি যে দেবার মুরোদ নেই । বুধু ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে আর ঈশ্বরের কাছে বলে ওঠে প্রভু এইভাবেই তুমি আমার কাছে সান্টাক্লস হয়ে এলে , হ্যাঁ আকাশে নয় এই পৃথিবীতেই তুমি আছো ।
Subscribe to:
Posts (Atom)
-
সান্টাক্লস শুভঙ্কর পাল নীল আকাশের দিকে চেয়ে থাকা চিমনীগুলো দিয়ে ধুঁয়া উড়ছে । বাঁকা সর্পিল ধুঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যেই মিশে থাকে বুধু ও ...




